কলুষিত সংস্কৃতির প্রভাবে আদর্শভ্রষ্ট তরুণ ও যুব সমাজ

এক সময় তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সের লোকেরা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখত। সিনেমা হলে নতুন সিনেমা আসলে এলাকায় মাইকিং করা হতো। বলা হতো ‘সপরিবারে দেখার মতো ছবি’।

কিন্তু এখন গ্রামের অনেক সিনেমা হল বন্ধ। নতুন সিনেমা আসার মাইকিংও এখন আর শোনা যাচ্ছে না। এর মানে এই নয় যে এখন আর কেউ সিনেমা দেখেনা? তা কিন্তু নয়, মানুষ এখনো সিনেমা দেখে।

বরং এখন সপরিবারে দেখার মতো সিনেমা খুব কমই তৈরি হয়। বিশেষ করে কিছু অশ্লীল সিনেমা নির্মাণের কারণে রুচিশীল দর্শকরা সিনেমা ছেড়েছে।

একই সঙ্গে সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়েছে। আর হলে গিয়ে সিনেমা দেখার প্রবণতা কমে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে- এখন প্রায় সব মানুষের হাতের মুঠোয়ই সিনেমা রয়েছে।

ঘরে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও হাতে ইন্টানেট সংযোগসহ মোবাইল ফোনে এখন সিনেমা দেখা যায়। শুধু সিনেমাই নয়, অশ্লীল নানা ফিল্ম তৈরি করে ইউটিউব ও ফেসবুকে ছেড়ে দিচ্ছে এক ধরনের কুরুচি সম্পন্ন পর্নোগ্রাফি ব্যবসায়ীরা।

এরা তরুণ ও যুবসমাজকে টার্গেট করে অশ্লীল ও যৌন উত্তেজক ভিডিও নির্মাণ করছে এবং ইউটিউব এবং ফেকবুকসহ নানা মাধ্যমে ছেড়ে দিচ্ছে।

আর এসব অশ্লীল পর্নোগ্রাফি দেখে দেখে বিকৃত মানসিকতার মানুষ তৈরি হচ্ছে সমাজে। তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। খুন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে এসব অশ্লীল ভিডিও অনেকংশেই দায়ী।

আমাদের আগামী প্রজন্মকে যদি স্বাভাবিক জীবন উপহার দিতে চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই সব ধরনের পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীল ফিল্ম কঠোরভাবে বন্ধ করে দিতে হবে।

গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসকে গ্রাস করে চলছে অপসংস্কৃতির কৃষ্ণ-কালো ছোবল। জীবনের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সমাজে বসবাসরত মানুষের প্রত্যেকটি কার্যকলাপই তাদের সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান।

কোনো সমাজই তাদের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করতে পারে না। মূলত সংস্কৃতি এবং জীবন একে-অপরের পরিপূরক। “সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা” অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য মানুষের নৈমিত্তিক প্রচেষ্টাই সংস্কৃতি, আর অপসংস্কৃতি হলো এর বিপরীত।

আত্মার মৃত্যু ঘটিয়ে অসুন্দরের উপাসনা করে, অকল্যাণের হাত ধরে বেঁচে থাকাই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি মানুষকে কলুষিত করে এবং জীবনের সৌন্দর্যের বিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়ে শ্রীহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। আজকের তরুণেরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

কিন্তু অপসংস্কৃতি তাদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজ শুদ্ধ সংস্কৃতি সাধনার পথ থেকে বিচ্যুত। তারা অসুন্দর ও কলুষিত সংস্কৃতি তথা অপসংস্কৃতির শিকার। যুবসমাজের একটা বড় অংশকে সুকৌশলে করা হয়েছে আদর্শভ্রষ্ট। সুন্দর জীবনের পথ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্ধকার জীবনের পথে। তারা তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার জগতে, অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়।

বিপুল সংখ্যক তরুণের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে অস্ত্র, জড়িয়ে ফেলা হয়েছে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড। তারা লিপ্ত হচ্ছে অসামাজিক কাজে। হিংসাশ্রয়ী-অশ্লীল চলচ্চিত্র, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিপন্থী বিকৃত রুচির নাচ-গান, রুচিগর্হিত পোশাক-পরিচ্ছদের প্রতি তাদেরকে আকৃষ্ট ও অনুরক্ত করার গভীর নীলনকশা ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে।

পোশাক-পরিচ্ছদে আমাদের নিজস্ব একটি ঐতিহ্য ছিল। বিদেশি সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ও চর্চা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছদে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। জিন্স, টি-শার্ট, স্কার্ট এখন আমাদের ছেলেমেয়েদের খুবই প্রিয়। শাড়ি-লুঙ্গি কিংবা পাজমা-পাঞ্জাবি এখন আর তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সমাজে অশ্লীলতা ছড়ানোয় বাংলাদেশে জাতীয় জীবনে অপসংস্কৃতির প্রবল প্রতাপ লক্ষণীয়। অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার এক উদ্ভট জোয়ার চলছে এ দেশে। বিশেষত এ দেশের তরুণ সমাজ আজ দিকভ্রান্ত, দিশেহারা। তাদের বেঁচে থাকার সাথে নীতির সম্পর্ক নেই। এই বোধ থেকেই অপসংস্কৃতির জন্ম হয়। সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা এখন হাস্যকর দুর্নীতি এখন সামাজিকভাবে স্বীকৃত। আর এখন অনৈতিকতার সূত্রপাত হচ্ছে মানুষের অসৎ জীবিকার্জনের হাত ধরে। সৎভাবে যে জীবিকার্জন না করে তার পক্ষে অপসংস্কৃতির দাসত্ব ছাড়া উপায় নেই। প্রতিদিনের সংবাদপত্র আমাদের সামনে যে চালচিত্র তুলে ধরে, তাতে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন অতি স্পষ্ট। অশ্লীলতা, নোংরামি, খুন, ছিনতাই, প্রতারণা সবই অপসংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন নাম। আমাদের সমাজ আজ এসবেরই দাসত্ব করে চলেছে।

অপসংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের গোটা জাতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। বিদেশি ফিল্ম, ভারতীয় সিরিয়াল পারিবারিক সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশে নাটকের মধুমাখা ভাষায় চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিষ মিশাচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতির যন্ত্রণায় এমনিতে পুরো জাতি অতিষ্ঠিত। তার সাথে পশ্চিমা সমাজের অশ্লীলতা মোকাবেলা করা তো আরো কঠিন হয়ে গেছে। বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, উগ্র পোশাক ও জীবনাচারের প্রচলন সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় টিভি সিরিয়াল আর পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ নেশার মতো। নেশা যেমন একটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। ঠিক তেমনি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও একটি দেশকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়। আমাদের সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতির ভোগবাদ, পোশাক-পরিচ্ছদ, অশ্লীলতা আর বেলেল্লাপনার মহোৎসব চলছে। যে কারণে বাড়ছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, বিবাহ-বিচ্ছেদ, অনৈতিক জীবনযাপনের অন্ধকারময়তার বিকৃত অনাচার। স

মাজের মধ্যে এইসব নেতিবাচক পরিবর্তন বাতাসের গতিকেও হার মানায়। একশ্রেণির খুচরা অন্ধ বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলতে নারাজ। এসব থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে এমন অন্ধকার রাত নেমে আসবে- যার সুবহে সাদিক হওয়া অসম্ভব।

Leave a comment